ইখতিলাফ ও তার প্রকারভেদ।
★আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্।
★ প্রজেক্ট- ইসলামের মূলধারা ও বাতিল ফিরকা★
★ পোস্ট নং--২৩
★বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
♦ইখতিলাফ ও তার প্রকারভেদ ♦
♣ এ পথিবীতে যতো ধর্মমত রয়েছে প্রত্যেক ধর্মেই মতানৈক্য বিদ্যমান। মৌলিক নীতিবিধান থেকে শুরু করে সামান্য বিষয় পর্যন্ত এ মতভেদ বিস্তৃত। কিন্তু, মহান আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলামে আকাঈদ বা মৌলিক বিশ্বাসে।ইখতেলাফ বা মতানৈক্যের কোন অবকাশ নেই। এতদসত্ত্বেও মুসলমানদের মধ্যে আক্বাঈদ বা মৌলিক বিশ্বাস বিষয়ে যতো মতভেদ এযাবৎ হয়ে আসছে অভিশপ্ত শয়তান, ইয়াহুদী-নাসারা ও অমুসলমানদের ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতা ও ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই হয়েছে। সাধারণ মুসলমানদের নিকট বড়ো প্রশ্ন হলো, আল্লাহ-এক, রাসুল (সাল্লাল্লাহ তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর, কোরআন এক, কেবলা এক; এতদসত্ত্বেও মুসলমানদের মধ্যে এতো মতভেদ কেন? আক্বীদাগত দিক থেকে সুন্নী, ওহাবী তাবলিগী, মওদুদী ইত্যাদি। আমলের দিক থেকে-হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্লবী।তরীকতের দিক থেকে কাদেরী, চিশতী, সোহরাওয়ার্দীয়া ও নকশবন্দীয়া ইত্যাদি। এ বিষয়ে বুঝতে হলে ইসলামী বিধানের প্রকারভেদ ও তার স্বরূপ জানতে হবে।আকাঈদের নির্ভরযোগ্য কিতাব শরহে আত্ত্বাঈদ-এ-নাসাফীর ভূমিকায় বর্ণিত-
ان الأحكام الشرعية منها ما يتعلق بكيفية العمل وتسمى فرعية وعمليةومنهامايتعلق بالاعتقادوتسمى اصلية واعتقادية-
অর্থাৎ শরীয়তের বিধানসমূহের মধ্যে অনেক গুলোর সম্পর্ক আসল পদ্ধতি ও পর্যায়ের সাথে রয়েছে । (যেমন ফরয, ওয়াজিব, মোস্তাহাব, হারাম ও মাকরূহ ইত্যাদি)। এগুলোকে বলা হয় আমল সংক্রান্ত ও শাখা-প্রশাখা বিষয়। (এসব বিষয় যে শাস্ত্রে আলোচিত হয় তাকে বলা হয়- ফিকাহ শাস্ত্র)। শরীয়তের অনেকগুলো বিষয় আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে সম্পূক্ত। এগুলোকে বলা হয় মৌলিক বা বিশ্বাস সম্পর্কিত বিধান। আমল সংক্রান্ত বিধানসমূহ তার বিস্তারিত দলীল সহকারে জানার নাম ‘ইলমুল ফিকহ, আকাঈদ সম্পর্কিত বিষয়সমূহ তার দলীল দ্বারা জানার নাম ইলমে কালাম’।
এক কথায় ইসলামের বিধান দু'প্রকারঃ
(১) আক্বাঈদ বা বিশ্বাস সম্পর্কিত বিধান। যেমন আল্লাহ তা'আলা একক অদ্বিতীয়, তিনি চিরন্তন, তার কোন সমকক্ষ নেই। নবী রাসুলগণ মাসুম বা নিস্পাপ। কবরের আযাব সত্য ইত্যাদি।
(২) আমল সম্পর্কিত বিধান। যেমন নামাজ, রোযা, হজ্ব, যাকাত, সদকায়ে ফিতর ও কোরবানী ইত্যাদি। প্রথম প্রকার হলে আসল ও মূল ভিত্তি।দ্বিতীয় প্রকারের যাবতীয় বিধান গ্রহণযোগ্য হবার জন্য আক্বাঈদ বিশুদ্ধ হওয়া পূর্বশর্ত।এ জন্য ইমামগণ বলেছেন-
ان كثرةالصلوةوالصيام لا ينفع مع العقيدة ألفا سدة-
অর্থাৎ আকীদা ভ্রান্ত হলে অধিক নামায ও রোযা কোন উপকারে আসবে না। এ জন্য কোরআন পাকে প্রথমে ঈমান, অতঃপর আমলের কথা বলা হয়েছে। যেমন-
وااعصرانلانسان فئة خسر الا الذين امنواوعملوالصالحة-
ঐ মাহবুবের যুগের শপথ, নিশ্চয় মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, কিন্তু যারা ঈমান-এনেছে এবং সৎকাজ করেছে।
অর্থাৎ প্রথম প্রকরের গুরুত্ব বর্ণনা করে ইমামগণ বলেন, যে ব্যক্তি ইলমে কালাম বা আক্বাঈদ সম্পর্কে জানলো না, সে আম্বিয়া কেরাম, কোরআন, হাদিস, উসূলে ফিকাহ ও ফিকাহ কিছুই জানলো না। (নিবরাস শরহে আকাঈদ-এ-নাসাফী,পৃষ্ঠা ১৩)।
ইসলামী বিধানের প্রকারান্তরে ইখতেলাফও দু'প্রকার।
(১) উসুলী ইখতেলাফ বা মৌলিক বিষয়ে মতভেদ,
(২) ফুরোয়ী ইখতেলাফ বা আমল সম্পর্কিত বিষয়ে মতভেদ। অতঃপর পবিত্র কোরআন ও হাদিসে যে ইখতিলাফ ও মতভেদকে উম্মতের ধ্বংস বা ভ্ৰষ্টতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তা হলো প্রথম প্রকার মতভেদ। এ প্রকার ইখতেলাফ থেকে দূরে থাকার জন্য পবিত্র হাদিসে হুযুর পুর নুর সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে বার বার সর্তক করেছেন। হযরত এরবায ইবনে সারিয়া রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে আছে, তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জিবীত থাকবে, তারা অদূর ভবিষ্যতে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তোমরা আমি ও আমার
হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের তরীকাকে অবলম্বন করো এবং মজবুতভাবে আকড়ে ধরো। (আংশিক) (ইবনে মাজা, আবু দাউদ, তিরমীযী, আহমদ)। অনুরূপভাবে হযরত আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত হাদিসে হযুর করিম সাল্লাল্লাহ তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নিশ্চয় তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ ধ্বংস হয়েছে তাদের নবীগণ সম্পর্কে ইখতেলাফ বা মতভেদের কারণে'। (ইবনে মাজা শরীফ)। আক্বাঈদ সম্পর্কিত বিষয়ে ইজতেহাদ জায়েয নেই। এ বিষয়ে ইজতেহাদ ভ্ৰষ্টতা ও আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে পড়ার কারণ। নিশ্চয়ই এটা জঘন্য পাপ। আক্বাঈদ সম্পর্কিত বিষয়ে 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের' আক্বীদা হলো সবচেয়ে নিরাপদ ও একমাত্র সঠিক পথ । (আল ঈমান ওয়াল ইসলাম,পৃষ্ঠা ৭৬,ইস্তাম্বুল, তুরষ্ক)।
ইসলামে এ যাবৎ যতো ভ্রান্ত দল-উপদলের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা মূলতঃ আক্বাঈদ বিষয়ে মতানৈক্যের ফলে ইসলামের মূল ধারা "আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত" থেকে বহির্ভূত হয়ে পড়েছে। ওহাবী, তাবলিগী, কাদিয়ানী, শিয়া এবং মওদুদী ইত্যাদি আকীদাগত মতভেদ।নিঃসন্দেহে এগুলো গোমরাহী; বরং এদের অনেক আকীদা কুফুরী। আক্বাঈদ পর্বে তা বিস্তারিত আলোচিত হবে।
দ্বিতীয় প্রকার ইখতেলাফ অর্থাৎ আমল সম্পর্কিত বিষয়ে মতভেদকে হাদিস শরীফে “রহমত” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ বিষয়ের উপর হযরত আল্লামা আবদুর রহমান জাযরী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি "রহমতুল উম্মা আলা ইখতেলাফিল আইম্মা" নামক একটি কিতাবও লিখেছেন, যা ইমাম আবদুল ওহাব শা'রানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখিত এতদসম্পর্কিত কিতাবের সাথে মুদ্রিত হয়েছে।এ সম্পর্কে ইমামগণ বলেন, ‘আমাদের ইমামদের মতভেদ হলো শরীয়তের মাসআলাসমূহ ইজতেহাদ ভিত্তিক। তাদের মধ্যে দ্বীনের মৌলিক বিষয়াবলী ও আক্বাঈদ সম্পর্কিত বিষয়ে কোন মতভেদ নেই।অনুরূপভাবে তাদের মধ্যে শরীয়তের ঐসব বিষয়েও কোন মতানৈক্য নেই যা দ্বীনের মৌলিক বিষয় হিসেবে হাদিসে মুতাওয়াতের দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে। তাদের মধ্যে শরীয়তের কিছু কিছু আমল সম্পর্কিত বিধান নিয়ে মতভেদ রয়েছে।এর কারণ হলো তাদের খোদাপ্রদত্ত বোধশক্তি ও দলিলের শক্তির তারতম্য।এ প্রকার ইখতেলাফকে পবিত্র হাদিসে উম্মতের জন্য “রহমত” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।অতঃপর হুযুর সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইচ্ছানুসারে এটা উম্মতের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত হয়েছে। (আল ঈমান ওয়াল ইসলাম পৃষ্ঠা ৭৬)
©(সংকলন- ইসলামের মূলধারা ও বাতিল ফিরকা।
লেখকঃ- মাওলানা কাযী মঈন উদ্দিন আশরাফী)।
♥
পোস্টটি শেয়ার করে অন্যদের জানার সুযোগ করার অনুরোধ রইল।
আমাদের সাথে থাকুন-
facebook.com/meitobimarenabiho
Comments
Post a Comment