উম্মত কারা

★আস্সালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ্★

★প্রজেক্ট- ইসলামের মূলধারা ও বাতিল ফিরকা★
★পোস্ট নং--০৫

★বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

                        #উম্মত_কারা?

★আলোচ্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “আমার উম্মত তিয়াত্তর দলে বিভক্ত হয়ে পড়বে। এতে 'উম্মত’ দ্বারা কাদের বুঝানো হয়েছে তার ব্যাখ্যায় হাদিস বিশারদগণ বলেন, উম্মত দুপ্রকার ।

(১) উম্মতে দাওয়াত’ অর্থাৎ যাদের প্রতি ইসলামের দাওয়াত রয়েছে; কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি। যেমন ইয়াহুদা-নাসারা, কাফির-মুশরিক ইত্যাদি।

(2) 'উম্মতে ইজাবাত’ অর্থাৎ যারা ইসলামের দাওয়াত কবুল করে মুসলমান হয়েছে। আলোচ্য হাদিসে দ্বিতীয় প্রকার উম্মতকেই বুঝানো হয়েছে। (মিরকাত শরহে মিশকাত)। মুসলমানদের মধ্যে তিয়াত্তর দলের আবির্ভাব ঘটবে, তন্মধ্যে একটি মাত্র দল ব্যতিরেকে অন্যসব দলই জাহান্নামী হবে। আর নাজাতপ্রাপ্ত সে দলটির নাম "আহলে সুন্নাত ওয়াল ।
জামাআত। আলোচ্য হাদিসে ‘বনী ইসরাঈল বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। অংশটিই প্রমাণ করে যে, উম্মত দ্বারা 'উম্মতে ইজাবাত’ বা মুসলমানদের কথা বুঝানো হয়েছে।মুসলিম মিল্লাতের কিছু আধুনিক শিক্ষিত ব্যক্তিকে এতদবিষয়ে অজ্ঞতাবশতঃ অথবা কোন না কোন বাতিল ফিরকার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ নিজেদের ভ্রান্তিকে গোপন করার উদ্দেশ্যে প্রায়শঃ বলতে শুনা যায়, আল্লাহ এক, রাসুল (সাল্লাল্লাহ তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক কোরআন এক, কেবলা এক, আবার মুসলমানদের মধ্যে এতো দলাদলি কেন? কেউ সুন্নী, কেউ ওহাবী কেউ তাবলিগী, কেউ মওদুদী, কেউ শিয়া আবার কেউ কাদিয়ানী, এ সব কি! সবাই মুসলমান। এগুলো আলেমদের হালুয়া রুটির সংস্থানের তদবীর মাত্র। এ ক্ষেত্রে তারা ঢালাওভাবে আলেমদেরকে দায়ী করে। এটা চরম অন্যায়। কারণ, এটা হালুয়া রুটি সংস্থানের ফন্দি' বলে উড়িয়ে দেয়ার মতো বিষয় নয়, যেহেতু খোদ আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহ তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লামই একথা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, সেহেতু এর পেছনে নীরেট সত্যতা ও বাস্তবতা রয়েছে বলে সকল মুসলমানদেরই আন্তরিক ভাবে বিশ্বাস করতে হবে। বাস্তবেও ঐ নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণীর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। কোন না কোন ভাবেই ইসলামের নামে, ইসলামের মূল রূপরেখার ধারক সুন্নী জামাআত ছাড়াও বহুবিধ দল-উপদলের সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং এ বাস্তব সত্যকে মেনে নিয়েই এর বিচার বিশ্লেষণ করাই হবে ন্যায়পরায়ন বুদ্ধিমানের কাজ। অতএব, ইসলামের নামে আত্মপ্রকাশ খারেজী কিংবা শিয়া সম্প্রদায় থেকে আরম্ভ করে বর্তমানকার তাবলিগী, কাদিয়ানী ও মওদুদী মতবাদী সম্প্রদায় পর্যন্ত যেসব দল উপদলের সৃষ্টি হয়েছে সেই দলগুলো সৃষ্টিকারী কারা তাদেরকে নিজেদের জ্ঞানেই চিহ্নিত করতে হবে। আরো চিহ্নিত করতে হবে তাদের উদ্দেশ্যকে । বস্তুতঃ যারা 'সুন্নী মতাদর্শ (হাদীস শরীফ অনুযায়ী) থেকে বিদ্যুৎ হয়ে ইসলামের নামে নতুন নতুন দল-উপদলের সৃষ্টি করেছে, তাদের কেউ কেউ যদি আলেমও হয়ে থাকে তাহলে ধরে নিতে হবে-তারা হয়ত আসলে 'আলেম' নামের উপযোগী নয়, নতুবা 'আলেমে সূ' বা মন্দতর আলেম'। হাদিস শরীফে আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, মন্দ লোকদের মধ্যে আলেম সর্বাপেক্ষা মন্দ হবে। কাজেই, তাদের দ্বারা সৃষ্ট দলাদলির উদ্দেশ্য হালুয়া রুটি। সংস্থানের' চাইতেও মন্দ কিছু হওয়াও স্বাভাবিক। উদাহরণ স্বরপ, আবদুল্লাহ ইবনে সাবা (শিয়া মতবাদের প্রবর্তক) আলেম হলেও সে ছিলো মুনাফিক, আসলে ইহদী। এদিকে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের নেতা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, তাবলিগী জমাতের প্রবর্তক মৌং ইলিয়াস মাওয়াতিন, মওদুদী মতবাদীদের নেতা তথাকথিত মাওলানা মওদুদী প্রমূখের অবস্থাদি সম্পর্কেও খবর নিন। তখনও একই ধরণের ফলাফল বেরিয়ে আসবে।

অতএব, এক্ষেত্রে ঢালাওভাবে আলেমদেরকে দায়ী করে কিংবা ‘হালুয়া রুটি গরম করার' তথাকথিত উদ্দেশ্যে এবং অপবাদ দিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। বরং হুযুর পাক সাল্লাল্লাহ তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঐ ভবিষ্যদ্বাণীর তাৎপর্যকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলইহি ওয়াসাল্লামের অদৃশ্য জ্ঞানের নির্ভুল বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ইসলামের একমাত্র সঠিক রূপরেখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত-এর সুশীতল ও নিরাপদ শামিয়ানা তলেই নিষ্ঠাপূর্ণভাবে নিজের অবস্থান গড়ে নেয়ার যে বিকল্প নেই তা-যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হবে। এটাই হলো সাহাবা কেরামের আদর্শ । কারণ, তাঁরা হুযুর সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী শ্ৰবণ করে এ বিশ্বাস নিয়ে চুপ চাপ বসে থাকেননি যে, আমরা তো স্বয়ং রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথেই আছি। আমাদের আর।কি ভয়; বরং তাঁরা জানতে চাইলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম! 'নাজাত প্রাপ্ত দল কোনটি'। অন্যথায় নামায, রোযা, হজ্জ যাকাত সহ ইসলামী বিধি বিধান পালন করেও আকীদাগত অ্যাপত্তির কারণে জাহান্নামী হতে হবে। সাহাবা কেরামের প্রশ্নের উত্তরে হযুর পাক সাল্লাল্লাহ তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি এবং আমার সাহাবীদের তরীকা ।” এর ব্যাখ্যায় হাদিস বিশারদগণ বলেন, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ঐ নাজাতপ্রাপ্ত দল হলো ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত'। (মিরকাত শরহে মিশকাত ১ম খও পৃষ্ঠা ২০৪)।
অতএব, সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, ইসলামের একমাত্র সঠিক রূপরেখা হল 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত । এ সত্যটি যখন সর্ব সাধারণের নিকট দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেছে, তখন শয়তান তার অনুসারীদেরকে নিজেদের ভ্রান্তি গোপন করে সরলপ্রাণ মুসলমানদেরকে ধোকায় ফেলার লক্ষ্যে এ কৌশল শিক্ষা দিল যে, তারা যেন নিজেদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অনুসারী বলে দাবী করে। পাক-ভারত উপমহাদেশে শয়তানের এ পরিকল্পনা ইদানিং পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় যাদের উপর আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহ তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেহেরবাণী হবে, যথাযথ ভাবে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের’ আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে।

অতঃপর উল্লেখিত হাদিস শরীফগুলোতে নাজাতপ্রাপ্ত দলের বেলায় নিম্নবর্ণিত নামগুলো বর্ণিত হয়েছে, সাবিলুল্লাহ (আল্লার পথ), ‘আল-জামাআত(নির্দিষ্ট দল), তায়েফাতুন'(ছোট একটি দল), ‘আস সাওয়াদুল আযম’ (বড় জামাআত), সুন্নাতী' (আমি রাসুল সাল্লাল্লাহ তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের তরীকা) ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে শাব্দিক পার্থক্য থাকলেও এর মর্মার্থ এক ও অভিন্ন। এর দ্বারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতকেই বুঝানো হয়েছে, এটাই মুহাদ্দেসীন কেরামের চূড়ান্ত অভিমত।
এখানে পাঠকের মনে একটি প্রশ্নের অবতারণা হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক যে, একটি হাদিসে "তায়েফাতুন"(ছোট দল) অপর একটি হাদিসে আস সাওয়াদুল। আযম’ (বড় দল) বর্ণিত হয়েছে। দুই বিপরীত অর্থবোধক পদের মর্ম এক ও অভিন্ন কিভাবে হবে। এর উত্তর এভাবে দেয়া যায়-*প্রথমতঃ ‘তায়েফাতুন’ বা ছোট দল বলতে উম্মতের ফকিহগণ ও মুজতাহিদগণকে বুঝানো হয়েছে। যাদের সংখ্যা সাধারণ উম্মতের সংখ্যার তুলনায় অনেক কম; কিন্তু তাদের অনুসারী অনেক । যারা হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করে, উমতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহ তাআলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করেছেন তারাই হলেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পথ প্রদর্শক সুতরাং তাদেরকেই হকের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে ঘোষণা দিয়েছেন হুযুর করিম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর বড় দল বলতে কোন নির্দিষ্ট কালের বা নির্দিষ্ট এলাকার বড় দল নয়; বরং ইসলামের অভ্যূদ্বয় থেকে অদ্যাবধি মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ মুসলমান যে আকীদা ও বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত ঐ দলের নাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত। সুতরাং কোন নির্দিষ্ট এলাকায় এক ব্যক্তি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অনুসারী আর বাকী।সবাই ভ্রান্ত দলের অনুসারী হলে সে ক্ষেত্রে অধিকাংশ 'সাওয়াদে আযম' বা বড়দল বলে বিবেচিত হবে না, বরং ঐ একজনই বড় দল হিসেবে বিবেচিত হবেন। কারণ, তার সম্পর্ক সাহাবা কেরাম, তাবেয়ীন, তবই তাবেয়ীন, ফোকাহা, মুহাদ্দেসীন ও সকল আউলিয়া কেরামের সাথে। পবিত্র কোরআনুল করীমে  হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম একা একজনকেই উখড(জাতি) হিসেবে অবহিত করা হয়েছে। আর এটা হল সত্যতার ভিত্তিতে। অর্থাৎ হকের উপর প্রতিষ্ঠিত একজনই একদল (মিরজাতুল মানাজিহ শরহে শিকাতুল মাসাবিহ, ১ম খন্ড)।

( সংকলন- ইসলমের মূলধারা ও বাতিল ফিরকা।
লেখকঃ- মাওলানা কাযী মঈন উদ্দিন আশরাফী।)।

Comments

Popular posts from this blog

ছবছে আওলা ও আ'লা হামারা নবী।

পিডিএফ বই ২৮ টি একত্রে।

মওদুদি মতবাদ।