কারবালার ইতিহাস পর্ব- ১৪,১৫,১৬।

কারবালার ইতিহাস (পর্ব-১৪)।

ঐতিহাসিক ১০ ই মহরম
-------------------------
দশ তারিখের রাত্রি হল, হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) তাঁর সফর সঙ্গীদের সবাইকে একত্রিত করলেন এবং বললেন, আমার প্রিয় সাথীরা! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আন্তরিকভাবে সন্তুষ্ট। আমি সানন্দে তোমাদেরকে অনুমতি দিচ্ছি যে, আজ রাতে তোমরা যে যেদিকে পার চলে যাও। এইসব ইয়াযীদী বাহিনীর লোকেরা আমার রক্ত পিপাসু। এরা একমাত্র আমার রক্তেই পরিতৃপ্ত হবে। তোমরা চলে যাও, তোমাদের জান বেঁচে যাবে। কিন্তু তাঁর সাথীদের মধ্যে একজনও যেতে রাজী হলেন না । বরং বললেন, এ নাজুক সময়ে আপনাকে শত্রুদের হাতেসোপর্দ করে কিভাবে চলে যেতে পারি! এ রকম পরিস্থিতিতে যদি আপনাকে ফেলে আমরা চলে যাই, কাল ক্বিয়ামতের মাঠে আমরা আল্লাহর রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে কিভাবে মুখ দেখাব? আল্লাহ্র রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলবেন, তোমরানিজেদের জানকে আমার প্রিয় দৌহিত্র হুসাইন এর জান থেকে প্রিয় মনে করেছ এবং তোমরা আমার দৌহিত্রকে শত্রুদের অস্ত্রের মুখেসোপর্দ করে চলে গেছ । না!না!! কিছুতেই আমরা আপনাকে ফেলে চলে যেতে পারি না। আমরা আপনার সাথেই থাকবো এবং আমরা আমাদের জানকে পতঙ্গের মতো উৎসর্গ করবো।যখন কেউই যেতে রাজি হলেন না, তখন হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) বললেন, তাহলে শুন! যদি তোমরা হুসাইনের সাথে থাকার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হও, তাহলে তোমরা ধৈর্য এবং আত্ম-বিশ্বাসে শিশাঢালা প্রাচীরের মতো অটল হয়ে যাও। এমন দৃঢ় ও অটল হয়ে যাও, যেন জুলুম-অত্যাচারের বিভীষিকা তোমাদের পদস্খলন ঘটাতে না পারে। বাতিলের সাথে মোকাবিলা করার সময়টা হলো, আমাদের পরীক্ষার সময়। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর বান্দাদের থেকে পরীক্ষা নিয়ে থাকেন । এখন আমাদের সামনে মুছীবতের পাহাড় । সমস্ত দুঃখ-দূর্দশা আমাদেরকে ধৈর্য সহকারে অতিক্রম করতে হবে। আল্লাহররাস্তায় অটল থাকতে হবে এবং এভাবে অটল থেকে শাহাদাতের শরবত পান করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদাহরণ রেখে যেতে হবে । হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর এ কথা তাঁর সাথীদের মধ্যে যথেষ্ট ধৈর্য শক্তি সৃষ্টি করলো । তাঁর (রাঃ) সকল সাথী তাঁর জন্য জান কুরবান করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং সকলেই শাহাদাত বরণের জন্য অনুপ্রাণিত হয়ে গেলেনএবং ধৈর্য ও ত্যাগ স্বীকারের জন্য দৃঢ় পাহাড় হয়ে গেলেন । রাত একটুগভীর হলে হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) তাঁর সাথীদের বললেন, তোমরা কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম করো। সকাল বেলা আল্লাহর হুকুমে যা হওয়ার তাই হবে ।তাঁর সাথীরা সবাই নিজ নিজ তাঁবুতে চলে গেলেন এবং তিনি নিজের তাঁবুতে কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন হলেন । কুরআন তিলাওয়াত করতে করতে তাঁর তন্দ্রাভাব আসায় তিনি কিছুক্ষণেরজন্য শুয়ে পড়লেন । তখন তিনি স্বপ্নে দেখলেন, তাঁর নানাজান (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাশরীফ এনেছেন এবং তাঁকে কোলে নিয়ে নিলেন এবং তাঁর বুকে হাত মুবারক রেখে বললেন- ﺍﻟﻠﻬﻢ ﺍﺕ ﺍﻟﺤﺴﻴﻦ ﺻﺒﺮﺍ ﻭﺍﺟﺮﺍ অর্থাৎ ‘হেআল্লাহ ! হুসাইনকে ধৈর্য ও পূণ্য দান করুনএবং হুসাইনকে আরও বললেন,তোমার উপর যা হচ্ছে, তা থেকে আমি বেখবর নই। আমি সবকিছু দেখছি। তোমার বিরুদ্ধে যারা তলোয়ার, তীর ইত্যাদি নিয়ে এসেছে, তারা সকলেই আমার শাফায়াত থেকে বঞ্চিত।হুযূর (ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটা বলে ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর অন্তরকে ধৈর্য এবং স্থিরতার খনি বানিয়ে চলে গেলেন । হযরত ইমামহুসাইন (রাঃ) ঘুম থেকে উঠে তাঁর বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবার পরিজনকে স্বপ্নের কথা শুনালেন। ফজরের নামাযের পর তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন- ‘ইয়া আল্লাহ! আপনার রাস্তায় আমাকে অটল রাখুন, মওলা ! ধৈর্য এবং সহনশীলতা দান করুন । হে মাওলা! জুলুম-অত্যাচারেরঝড় তুফান আমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে, আপনি আমাকে অটলথাকার তাওফীক দান করুন, যেন জুলুম-অত্যাচার আমাকে পদচ্যুত করতে না পারে।’ এভাবে তিনি মুনাজাত করছিলেনআর তাঁর (রাঃ) সাথীরা আমীন, আমীন বলছিলেন।এদিকে পিপাসাকাতর আল্লাহর নেক বান্দাগণ ধৈর্য এবং সহনশীলতার জন্য আল্লাহ পাক উনার কাছে প্রার্থনা করছেন, অন্যদিকে ইয়াযীদের সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধেরমহড়া দিচ্ছে । দুর্যোগের কালো মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল, ইয়াযীদের সৈন্যরা লম্ফ-ঝম্ফ দিতে লাগল, তাদের মধ্যে কতেক জাহান্নামী ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর তাঁবুর আশে-পাশে চক্কর দিতে লাগল এবং গর্ব ও অহংকারভরে হুঙ্কার দিয়ে বলতে লাগল, এমন কোন বাহাদুর আছ? থাকলে আমাদের মোকাবিলায় আস । ইত্যবসরে যালিমদের মধ্যে কেউ হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালাম উনার তাঁবুরদিকে তীর নিক্ষেপ করল এবং মোকাবিলার জন্য হুঙ্কার দিল।

কারবালার ইতিহাস পর্ব-১৫।

হযরত ইমাম হুসাইন (র:) এর অনুসারীদের শাহাদাত
--------------------------
হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর সাথীরা, যারা শাহাদাত বরণ করার জন্য উদগ্রীব ছিলেন, তাঁরা মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন এবং হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর অনুমতি প্রার্থনা করলেন । হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) তাঁদেরকে অনুমতি দিলেন । অনুমতি পেয়ে তারা বীর বিক্রমে যুদ্ধ ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন । তিন দিনের পিপাসাকাতর এবং ভুখা সঙ্গীরা সবর এবং ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা দেখালেন । ভুখা ও পিপাসার্ত হলে কি হবে, তারা ঈমানী বলে বলীয়ান ছিলেন । এদের একজন ওদের দশজনের থেকেও অধিক শক্তিশালীছিলেন । প্রচন্ড যুদ্ধ করে অনেক ইয়াযীদী বাহিনীকে জাহান্নামে পাঠিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরা এক এক করে শাহাদাত বরণ করেন । হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) নিজের চোখের সামনে তাঁর এই পঞ্চাশজন সাথীর শাহাদাত বরণ দেখলেন । এত কিছু দেখার পরও তিনি ধৈর্যচ্যুত হলেন না; তাঁর (রাঃ) সাথীদের বুকে তীর নিক্ষেপ অবলোকন করছেন আর বলছেন-ﺭﺿﻴﺖ ﺑﻘﻀﺎﺋﻚ ‘রদ্বীতু বিক্বদ্বায়িকা’ অর্থাৎ মাওলা! আমি আপনার ইচ্ছা এবং আপনার সিদ্ধান্তের উপর রাজী ।পঞ্চাশজন সাথী শহীদ হওয়ার পর তাঁর (রাঃ) মুষ্ঠিমেয় কয়েকজন আপনজন ছাড়া আর কেউ রইলো না ।

কারবালার ইতিহাস-পর্ব-১৬
হযরত ইমাম হুসাইনের মর্মস্পর্শী ভাষন এবং হুরের স্বপক্ষ ত্যাগ
--------------------------
হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)এর আপন
জনের মধ্যে ভাই ছিল,
ভ্রাতুষ্পুত্র ছিল, ভাগিনা ছিল
এবং ছেলে ছিল । তিনি কাউকে
কিছু না বলে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে
ইয়াযীদের সৈন্যদের সামনে
গেলেন এবং বললেন,
তোমাদের মধ্যে আহলে রসূল
(ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম)এর সাহায্যকারী কেউ
আছো কি? এ সঙ্কটময় মুহূর্তে
আওলাদে রসূল (ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর
সাহায্যকারী কেউ আছো কি?
আহলে রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম) এর সাহায্য করে
বেহেশ্তে গমনের ইচ্ছুক কেউ
আছো কি ?
তাঁর এ আহবানে ইয়াযীদী
বাহিনীর হুর বিন ইয়াযীদ
রিয়াহীর অন্তরে বিপ্লব শুরু হয়ে
গেল । সে ঘোড়ার উপর অস্বস্তি
বোধ করতে লাগলো । তার এই
অবস্থা দেখে তার এক সঙ্গী
জিজ্ঞাসা করলো- হুর! কি হল?
তোমার এই অবস্থা কেন?
তোমাকে বড়ই ব্যতিব্যস্ত
দেখাচ্ছে কেন ? আমি তোমাকে
অনেক বড় বড় যুদ্ধ ময়দানে
দেখেছি । কিন্তু কোন সময়
তোমাকে আমি এ রকম
অস্বাভাবিক অবস্থায় দেখিনি ।
কিন্তু এখন তোমার এই অবস্থা
কেন ? হুর বলল, কি বলবো, আমি
আমার একদিকে বেহেশ্ত দেখছি
আর এক দিকে দোযখ । মাঝখানে
অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছি এবং
কি করব তা চিন্তা করছি ।
একদিক আমাকে দোযখের দিকে
টানছে আর একদিক বেহেশ্তের
দিকে আহবান করছে । এটা বলার
পর পরই তিনি ঘোড়াকে চাবুক
মেরে এক নিমিষে ইয়াযীদী
বাহিনী থেকে এ বলে বের হয়ে
আসলেন, ‘যেতে হলে বেহেশ্তেই
যাব।’ শত্রু বাহিনী থেকে বের
হয়ে হুর জোর গলায় বললেন, দেখ,
জাহান্নাম থেকে
আল্লাহওয়ালা বের হচ্ছে ।
আসলে একজন বের হয়ে আসার
দ্বারা হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ)
বাহিনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য
কোন পরিবর্তন হল না । আর
ইয়াযীদী বাহিনীরও হাজারের
মধ্যে একজন চলে যাওয়ায় তেমন
কোন ক্ষতি হলো না । কিন্তু
আসল কথা হলো, হুর ছিল
বেহেশ্তী কিন্তু অবস্থান করছিল
দোযখীদের সাথে ।
হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) তাঁর
আধ্যাত্মিক দূরদৃষ্টি দ্বারা
অবলোকন করলেন যে, জান্নাতী
দোযখীদের মধ্যে অবস্থান করছে
। তাই ইমাম হুসাইন (রাঃ) ডাক
দিলেন, তাঁর ডাকটা ছিল হুরের
ইয়াযীদী বাহিনী থেকে বের
হয়ে আসার একটা উপলক্ষ মাত্র ।
হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) এর
দ্বারা তাঁর বেহেস্তের রাস্তা
পরিষ্কার হয়ে গেল । হুর বের হয়ে
সোজা হযরত ইমাম হুসাইন
(রাঃ)এর সামনে আসলেন এবং
বলতে লাগলেন,
ওগো রসূল (ছল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম)এর আওলাদ! আপনি
যে ডাক দিয়েছেন, ‘এ নাজুক
সময়ে আওলাদে রসূল (ছল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর
সাহায্য করে বেহেশ্তে যাওয়ার
মত কেউ আছে কিনা’ আমি সেই
ডাকে সাড়া দিয়ে ইয়াযীদ
বাহিনী থেকে বের হয়ে এসেছি
। তাই আমি যদি আজ আপনার
সাহায্যার্থে জান কুরবান করি,
তাহলে সত্যিই কি আপনার
নানাজান (ছল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়া সাল্লাম)এর শাফায়াত
নসীব হবে?
উনি বললেন, ইনশাআল্লাহ হবে ।
হুর বললেন, আপনি আমার জন্য দুয়া
করুন, আল্লাহ তায়ালা যেন
আমার বিগত দিনের পাপ মাফ
করে দেন এবং আমার গড়িমসিকে
ক্ষমা করে দেন । আমি আপনার
পক্ষে জান কুরবান করার জন্য
যাচ্ছি । এ বলে হুর কোমর থেকে
তলোয়ার বের করে ইয়াযীদী
বাহিনীর সামনে গেলেন । হুরকে
দেখে ইয়াযীদী বাহিনীর
সেনাপতি আমর বিন সা’দ
সৈন্যদেরকে বললো, দেখ, হুর ছিল
আমাদের বাহিনীর সেনাপ্রধান
। সে এখন আমাদের শত্রুদের
হাতে হাত মিলিয়েছে । সে
আমাদের সাথে
বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ।
তোমরা তাকে এমন শিক্ষা দাও,
যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে
শিক্ষণীয় হয়ে থাকে । এরপর
ইয়াযীদী বাহিনী চারিদিক
থেকে আক্রমণ শুরু করলো । হযরত
হুরও এমন জোরে আক্রমণ শুরু করে
দিলেন যে, ইয়াযীদী বাহিনীর
জন্য যেন খোদার গযব নাযিল
হলো। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্ষত-
বিক্ষত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন।

Comments

Popular posts from this blog

ছবছে আওলা ও আ'লা হামারা নবী।

পিডিএফ বই ২৮ টি একত্রে।

মওদুদি মতবাদ।